ক্যালকুলেটরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ক্যালকুলেটরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ক্যালকুলেটর কোনো একদিনে আবিষ্কৃত হয়নি। এটি হাজার বছরের বিবর্তনের ফল। এর শুরু হয়েছিল প্রাচীন 'অ্যাবাকাস' থেকে এবং আজ তা আমাদের স্মার্টফোনের একটি সাধারণ অ্যাপে পরিণত হয়েছে। গণনার আদি যুগ: অ্যাবাকাস (খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ - ২৩০০) গণনার প্রথম কার্যকর যন্ত্র হলো অ্যাবাকাস। মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক) এবং পরে চীন ও মিশরে এর ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। এটি কাঠের ফ্রেমে সুতো বা রড দিয়ে সাজানো কিছু গুটির সমন্বয়ে তৈরি। হাতের আঙুলে গণনার সীমাবদ্ধতা দূর করতে এটিই ছিল প্রথম বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। মেকানিক্যাল ক্যালকুলেটরের সূচনা (১৭শ শতাব্দী) প্রকৃত যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরির প্রচেষ্টা শুরু হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে। ১. উইলহেম শিকার্ডের 'ক্যালকুলেটিং ক্লক' (১৬২৩) জার্মান অধ্যাপক উইলহেম শিকার্ড প্রথম একটি যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর তৈরির নকশা করেন। এটি যোগ ও বিয়োগ করতে পারতো। তবে এটি অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ সময় লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। ২. ব্লেইজ প্যাসকেলের 'প্যাসকালাইন' (১৬৪২) ⚙️ ফরাসি গণিতবিদ ও পদার্থবিদ ব্লেইজ প্যাসকেল মাত্র ১৯ বছর বয়সে এটি তৈরি করেন। তার বাবা ছিলেন একজন কর সংগ্রাহক। বাবার হিসাবের কাজ সহজ করতেই তিনি এটি বানান। এটি ছিল পৃথিবীর প্রথম সফল যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর। এটি চাকার গিয়ার ব্যবহার করে কাজ করতো। ৩. গটফ্রিড লাইবনিজের 'স্টেপড রেকনার' (১৬৯৪) জার্মান গণিতবিদ লাইবনিজ প্যাসকেলের যন্ত্রকে আরও উন্নত করেন। এটি প্রথম যন্ত্র যা যোগ-বিয়োগের পাশাপাশি গুণ ও ভাগ করতে পারতো। তিনি বর্তমান কম্পিউটারের ভিত্তি 'বাইনারি সংখ্যা পদ্ধতি' নিয়েও কাজ করেছিলেন। বাণিজ্যিক ক্যালকুলেটরের প্রসার (১৯শ শতাব্দী) ১৮২০ সালে চার্লস জেভিয়ার টমাস 'অ্যারিথমোমিটার' নামক একটি যন্ত্র তৈরি করেন। এটিই ছিল প্রথম সফল বাণিজ্যিক ক্যালকুলেটর যা বড় বড় অফিস বা ব্যাংকগুলো ব্যবহার শুরু করে। ১৮৮৭ সালে ডর ই. ফেল্ট তৈরি করেন 'কম্পটোমিটার', যা বোতাম টিপে কাজ করার পদ্ধতি চালু করে। ইলেকট্রনিক ক্যালকুলেটরের বিপ্লব (২০শ শতাব্দী) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ভ্যাকুয়াম টিউব এবং পরবর্তীতে ট্রানজিস্টরের উদ্ভাবন ক্যালকুলেটরকে ছোট ও দ্রুততর করে তোলে। প্রথম ইলেকট্রনিক ক্যালকুলেটর (১৯৬১): ব্রিটিশ কোম্পানি 'বেল পাঞ্চ' প্রথম সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক ডেস্কটপ ক্যালকুলেটর ANITA বাজারজাত করে। এটি বেশ বড় আকারের ছিল। হ্যান্ডহেল্ড বা পকেট ক্যালকুলেটর (১৯৬৭-১৯৭০): টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস (TI) ১৯৬৭ সালে প্রথম পকেট ক্যালকুলেটরের প্রোটোটাইপ তৈরি করে। তবে বাণিজ্যিক সাফল্য আসে ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে। জাপানি কোম্পানি শার্প (Sharp) এবং ক্যানন (Canon) পকেট ক্যালকুলেটরকে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসে। ডিজিটাল ও আধুনিক যুগ ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্যালকুলেটরে এলসিডি (LCD) ডিসপ্লে এবং সোলার পাওয়ার ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে ব্যাটারির ঝামেলা কমে যায়। ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে গ্রাফিক ক্যালকুলেটর তৈরি হয়, যা জটিল গাণিতিক গ্রাফ এবং প্রোগ্রামিং করতে সক্ষম। বর্তমানে আলাদা ক্যালকুলেটর যন্ত্রের ব্যবহার কমে গেছে। কারণ প্রতিটি স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং স্মার্টওয়াচে এখন শক্তিশালী ক্যালকুলেটর বিল্ট-ইন থাকে। ক্যালকুলেটরের উদ্ভাবন ও প্রভাব ক্যালকুলেটরের উদ্ভাবন মানুষের চিন্তার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। শ্রম লাঘব: বড় বড় গাণিতিক হিসাব যা করতে আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগত, এখন তা কয়েক সেকেন্ডে সম্ভব। নির্ভুলতা: মানুষের ভুল করার সম্ভাবনা থাকলেও যন্ত্রের নির্ভুলতা হিসাব-নিকাশকে নিরাপদ করেছে। শিক্ষা ও বিজ্ঞান: প্রকৌশল ও মহাকাশ গবেষণায় ক্যালকুলেটর ছাড়া অগ্রগতি কল্পনা করা অসম্ভব। 💡 একটি মজার তথ্য: প্রথমদিকের যান্ত্রিক ক্যালকুলেটরগুলো এতই দামী ছিল যে শুধুমাত্র রাজপরিবার বা বিশাল ধনী ব্যবসায়ীরা তা কিনতে পারতেন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url