বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরু ও তাদের আকাশচুম্বী দামের রহস্য
১. বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরুর বর্তমান রেকর্ড
বর্তমান বিশ্বে
সবচেয়ে দামি
গরুর
রেকর্ডটি রয়েছে
ব্রাজিলের একটি
নেলোর
(Nelore) জাতের
গরুর
দখলে।
‘ভিয়াটিনা-১৯’
নামের
এই
নেলোর
গাভীটির এক-তৃতীয়াংশ মালিকানা ২০২৪ সালে প্রায়
৪.৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে
(বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায়
৫০
কোটি
টাকা)
বিক্রি
হয়।
সেই
হিসাবে
পুরো
গরুটির
মোট
মূল্য
দাঁড়িয়েছে প্রায়
১৫
কোটি
মার্কিন ডলার।
সাদা
রঙের
এই
গরুর
জাতটি
মূলত
ভারত
থেকে
ব্রাজিলে নিয়ে
যাওয়া
হয়েছিল,
যা
সেখানে
অত্যন্ত সফলভাবে লালন-পালন করা হচ্ছে।
২. মাংসের বাজারে সেরা: জাপানি ওয়াগিউ ও কোবে ব্রিড
মাংসের দিক থেকে বিচার করলে বিশ্বের সবচেয়ে দামি গরুর জাত হলো জাপানের ‘ওয়াগিউ’ (Wagyu)। ওয়াগিউ শব্দের অর্থই হলো জাপানি গরু। এই জাতের একটি গরুর দাম প্রায় ৩০ হাজার ডলার বা তার বেশি হতে পারে। আর এই ওয়াগিউ জাতের মধ্যে সবচেয়ে সেরা এবং দামি মাংসের ব্র্যান্ড হলো ‘কোবে’ (Kobe)। কোবে গরুর মাংসের প্রতি কেজির দাম ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার পর্যন্ত হয়ে থাকে।
৩. কেন এই গরুর দাম এত বেশি?
সব গরু
একই
প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী
হলেও
কিছু
বিশেষ
গুণের
কারণে
এদের
দাম
সাধারণ
গরুর
চেয়ে
শতগুণ
বেশি
হয়:
· বংশগত শ্রেষ্ঠত্ব (Premium Genetics): দামি
গরুগুলোর ডিএনএ
বা জিনগত
বৈশিষ্ট্য সাধারণ
গরুর চেয়ে
সম্পূর্ণ আলাদা
এবং উন্নত
মানের হয়।
· ভ্রূণ ও ক্লোনিং ক্ষমতা: ভিয়াটিনা-১৯-এর মতো দামি
গাভী থেকে
বৈজ্ঞানিক উপায়ে
(FIV বা ইন
ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) প্রচুর পরিমাণে
ডিম্বাণু ও
ভ্রূণ সংগ্রহ
করা হয়।
এই ভ্রূণ
অন্য সাধারণ
গরুর জরায়ুতে
প্রতিস্থাপন করে
হুবহু একই
মানের কোটি
টাকার বাছুর
জন্ম দেওয়া
সম্ভব।
· মাংসের মার্বেলিং (Marbling): ওয়াগিউ
গরুর মাংসের
ভেতরে চর্বিগুলো
এমনভাবে সুক্ষ্ম
রেখার মতো
ছড়িয়ে থাকে
যা দেখতে
মার্বেল পাথরের
মতো লাগে।
একে মার্বেলিং
বলে। সাধারণ
গরুর চর্বি
মাংসের একপাশে
জমে থাকে,
কিন্তু দামি
গরুর চর্বি
মাংসের পেশির
ভেতরেই সমানভাবে
মিশে থাকে।
৪. এই গরুর মাংস খেতে এত সুস্বাদু কেন?
দামি গরুর
মাংস
মুখে
দিলেই
মাখনের
মতো
গলে
যায়।
এর
সুস্বাদু হওয়ার
বৈজ্ঞানিক কারণগুলো নিচে
দেওয়া
হলো:
·
কম তাপমাত্রায় চর্বি গলা: ওয়াগিউ বা
কোবে গরুর
শরীরে থাকা
চর্বি বা
স্যাচুরেটেড ফ্যাটের
গলনাঙ্ক মানুষের
শরীরের স্বাভাবিক
তাপমাত্রার চেয়েও
কম। ফলে
রান্না করা
মাংস মুখে
দেওয়া মাত্রই
ভেতরের চর্বি
গলে এক
অসাধারণ রসালো
অনুভূতির সৃষ্টি
করে।
· আরামদায়ক লালন-পালন: জাপানের খামারিরা এই গরুগুলোকে অত্যন্ত বিলাসবহুল পরিবেশে বড় করেন। অনেক খামারে গরুর রক্তসঞ্চালন বাড়াতে এবং পেশি নরম রাখতে নিয়মিত ম্যাসাজ বা মালিশ করে দেওয়া হয়। কোনো কোনো খামারে গরুর হজমশক্তি ও ক্ষুধা বাড়াতে বিশেষ পানীয় বা জাপানি বিয়ার খাওয়ানো হয়।
·
মানসিক চাপমুক্ত জীবন: এই গরুগুলোকে
কোনো ধরনের
মানসিক চাপ
(Stress) বা ভয়ের
মধ্যে রাখা
হয় না।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায়
দেখা গেছে,
পশুর মানসিক
চাপ কম
থাকলে তার
মাংস নরম
ও সুস্বাদু
হয়।
৫. কোনো কোনো দেশে এই মাংস বেশি পাওয়া যায়?
সবচেয়ে দামি
ও সুস্বাদু গরুর মাংস মূলত
উন্নত
বিশ্বের নির্দিষ্ট কিছু
দেশে
সবচেয়ে
বেশি
উৎপাদিত ও ব্যবহৃত হয়:
·
জাপান: এটি ওয়াগিউ
এবং কোবে
মাংসের আদি
জন্মভূমি। জাপানের
হিয়োগো জেলা
কোবে মাংসের
জন্য বিশ্ববিখ্যাত।
·
ব্রাজিল: নেলোর জাতের
দামি গরুর
সবচেয়ে বড়
হাব বা
কেন্দ্র হলো
ব্রাজিল। দেশটির
আবহাওয়া এই
গরুর উপযোগী।
·
অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র: জাপানের বাইরে
অস্ট্রেলিয়া এবং
আমেরিকা কৃত্রিম
প্রজননের মাধ্যমে
নিজস্ব প্রযুক্তিতে
ওয়াগিউ জাতের
গরু ব্যাপকভাবে
উৎপাদন করছে
এবং বিশ্ববাজারে
রপ্তানি করছে।
·
মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপ: দুবাই, কাতার, লন্ডন বা
প্যারিসের মতো
শহরের ফাইভ-স্টার হোটেল এবং
বিলাসবহুল রেস্তোরাঁগুলোতে এই দামি
গরুর মাংসের
ব্যাপক চাহিদা
রয়েছে।
৬. সব গরু একই প্রজাতি হলে পার্থক্য কেন হয়?
যদিও জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সব গৃহপালিত গরুই ‘বস টরাস’ (Bos taurus) বা ‘বস ইন্ডিকাস’ (Bos indicus) প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত, তবুও মানুষের তৈরি কৃত্রিম নির্বাচন (Artificial Selection) এবং শত বছরের নিয়ন্ত্রিত প্রজননের কারণে এদের মাঝে আকাশ-পাতাল পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
সাধারণ গরু যেখানে শুধু দুধ ও সাধারণ মাংসের জন্য লালিত হয়, সেখানে এই বিশেষ জাতগুলোকে তৈরিই করা হয়েছে তাদের রাজকীয় জিন ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির মাংসের জন্য। এটি ঠিক সাধারণ গাড়ির সাথে ফেরারি বা রোলস রয়েলস গাড়ির পার্থক্যের মতোই।
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url